Monday, April 21, 2014

খনার বচন এবং আমাদের কৃষি ঐতিহ্য। (২য় পর্ব)

দিনে জল রাতে তারা, এই দেখবে খরার ধারা।
অর্থঃ বর্ষার শুরুতে যদি দিনে বৃষ্টিপাত হয় আর রাতের আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে সে বছর খরা হবে।

আষাঢ় নবমী শুক্ল পক্ষা, কি কর শ্বশুর লেখা জোখা
যদি বর্ষে মুষল ধারে, মাঝ সমুদ্রে বগা চড়ে
যদি বর্ষে ছিটে ফোটা, পর্বতে হয় মীনের ঘটা
যদি বর্ষে রিমঝিমি, শস্যের ভার না সহে মেদেনী
হেসে সূর্য বসেন পাটে, চাষার বলদ বিকোয় হাটে।

অর্থঃ আষাঢ় মাসের প্রথম চাঁদের শুক্ল পক্ষের নবমীর দিন অর্থাৎ চন্দ্র মাসের নয় তারিখে যদি মুষল ধারে বৃষ্টি হয় তাহলে বর্ষা কম হবে। যদি সামান্য ছিটে ফোটা বৃষ্টি হয় তাহলে বর্ষা বেশী হবে। সেদিন মাঝারী বৃষ্টিপাত হলে ফসলের উৎপাদন ভালো হবে আর যদি আদৌ বৃষ্টি না হয় তাহলে সেবছর ভালো ফসল হবেনা।

স্বর্গে দেখি কোদাল কোদাল মধ্যে মধ্যে আইল
ভাত খাইয়া লও শ্বশুর মশাই বৃষ্টি হইবে কাইল।

অর্থঃ যদি ছোট ছোট খন্ড খন্ড মেঘে আকাশ ভর্তি থাকে তাহলে পরদিন বৃষ্টি হবে।

চৈতে কুয়া ভাদ্রে বান, নরের মুন্ড গড়াগড়ি যান।
অর্থঃ চৈত্র মাসে কুয়াশা অথবা ভাদ্রমাসে বন্যা দেখাদিলে মহামারী হয়।

যদি ঝরে কাত্তি, সোনা রাত্তি রাত্তি
যদি ঝরে আগন, হাতে কুলায় মাগন।

অর্থঃ কার্তিক মাসে বৃষ্টি হলে ধানের উৎপাদন ভালো হয়। আর অগ্রহায়ণে বৃষ্টি হলে ধান নষ্ট হবে।

জৈষ্ঠ্যে শুখা আষাঢ়ে ধারা, শস্যের ভার সহে ধরা।
অর্থঃ জৈষ্ঠ্যমাসে প্রচন্ড খরা হলে আষাঢ় মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর প্রচুর ফসল ফলবে।

পশ্চিমে ধনু নিত্য খরা, পূর্বে ধনু বর্ষে ধারা।
অর্থঃ পশ্চিমে রংধনু দেখা গেলে সেটা খরার লক্ষণ আর পুবে রংধনু দেখা গেলে বৃষ্টিপাতের লক্ষণ।

দূর সভা নিকট জল, নিকট সভা রসাতল।
অর্থঃ চন্দ্রসভা বা চাঁদের চারিদিকে মেঘের বৃত্ত বড় হলে তাড়াতাড়ি প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে আর চন্দ্রসভা ছোট আকৃতির হলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম।

ধানের গাছে শামুকের পা, বন বিড়ালী করে রা
গাছে গাছে আগুল জ্বলে, বৃষ্টি হবে খনায় বলে।

অর্থঃ শামুক ধান গাছ বেয়ে উপরে উঠতে থাকলে শিঘ্রই প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে।

আমে ধান, তেতুলে বান।
অর্থঃ যে বছর আম বেশী ফলে সেবছর ধানও বেশী হয়। যেবছর তেতুল বেশী ফলে সে বছর ঝড় বন্যা বেশী হয়।

বিয়ানে আউলি বাউলি, দুপুরে বাউ, দিনে বলে খরানের ঘর যাও।
অর্থঃ সকালে মেঘলা আকাশ দুপুরে প্রবল বাতাস খরার লক্ষণ।

চাঁদের সভায় বসে তারা, জল পড়ে মুষল ধারা।
অর্থঃ চন্দ্রসভার ভেতরে তারা দেখা গেলে মুষল ধারায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

আগে পাছে ধনু চলে মীন অবধি তুলা
মকর মুম্ভ বিছা দিয়া কাল কাটায়ে গেলা।

অর্থঃ পৌষ মাসের ৩০ দিন কে ১২ ভাগে ভাগ করলে প্রতি ভাগে আড়াই দিন করে পরে। এর প্রথম ও শেষ সোয়া দিন পৌষের জন্য রেখে প্রথম সোয়া দিনের থেকে প্রতি আড়াই দিন ক্রমে মীন অর্থ্যাত চৈত্র মাস থেকে প্রতি মাসের জন্য গণনা করতে হবে। পৌষের এই ভাগ সমুহের ক্রমে যে আড়াই দিনে যেরুপ আবহাওয়া থাকবে সেই মাসেও তদ্রপ আবহাওয়া হবে

খনার বচন এবং আমাদের কৃষি ঐতিহ্য। (১ম পর্ব)

কলা রুয়ে না কেট পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।
অর্থঃ কলাগাছের পাতা না কাটলে তাতে কলার ফলন ভালো হয়।

নারিকেল গাছে নুনে মাটি, শীঘ্র শীঘ্র বাধে গুটি।
অর্থঃ নারিকেল গাছের গোড়ায় লোনা মাটি দিলে নারিকেলের ফলন ভালো হয়।

হাত বিশেক করি ফাঁক, আম কাঠাল পুতে রাখ।
অর্থঃ বিশ হাত ফাঁক করে আম কাঁঠাল গাছ না বুনলে গাছে ভালো ফল আসেনা।

ডাক দিয়া বলে মিহিরের স্ত্রী শোন পতির পিতা,
ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা।
রাজ্য নাশ গো নাশ হয় অগাধ বান,
হাতে কাঠা গৃহী ফিরে কিনতে না পায় ধান।

অর্থঃ ভাদ্র মাসে ভুমিকম্প হওয়া বড় বন্যা এবং ফসলের দারুণ ক্ষতির লক্ষণ।

শুক্লপক্ষে ফসল বুনে, ছালায় ছালায় টাকা গুনে।
অর্থঃ চাঁদের শুক্লপক্ষে ফসল বুনলে ফলন ভালো হয়।

আষাঢ় শ্রাবণে টুটে পানি, তার মর্ম পাছে জানি।
অর্থঃ আষাঢ় শ্রাবণ মাসে বর্ষা কম হলে পরে বন্যা হয়।

মানুষ মরে যাতে, গাছলা সারে তাতে।
পচলা সরায় গাছলা সারে, গোধুলা দিয়ে মানুষ মারে।

অর্থঃ যে স্থান মানুষ বাসের অযোগ্য সে স্থানে গাছ ভালো হয়। পচা দুর্গন্ধ মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও গাছের জন্য তা উপকারী।

বাপ বেটায় করবে চাষ, তাতে পুরবে মনের আশ।
অর্থঃ নিজের আত্নজ ব্যাতিত সম্পূর্ণ অন্যের উপর চাষের ভরসা করলে চাষাবাদের ক্ষতি হয়।

ক্ষেতের কোনা, বাণিজ্যের সোনা।
অর্থঃ কৃষিকাজ বাণিজ্যের থেকে উত্তম।

কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, বাঁশ করে টাস টাস।
অর্থঃ সময়ের চাষ সময়ে না করলে ফসল অনিশ্চিত।

সাত হাত তিন বিঘতে, কলা লাগায় মায়ে পুতে।
অর্থঃ সাত হাত পর পর তিন বিঘা গর্ত খুড়ে কলাগাছ লাগাতে হয়।

খনা বলে চাষার পো, আশ্বিনের শেষে সরিষা রো।
অর্থঃ আশ্বিন মাসের শেষে সরিষা বনতে হয়।

ষোল চাষে মুলা, তার অর্ধেক তুলা
তার অরধেক ধান, বিনা চাষে পান।

অর্থঃ মুলাতে সবচে বেশী চাষ দিতে হয় আর চাষ ছাড়াই পান উৎপাদন করা যায়।

গাই দিয়া বায় হাল, দুঃখ তার চিরকাল।
অর্থঃ গাই দিয়ে হাল বাইতে হয়না।

কচু বনে ছড়ালে ছাই, খনা বলে তার সংখ্যা নাই।
অর্থঃ ছাই কচুগাছের জন্য উপকারী।

খনার বচন সমগ্র

(ক)
‘খনা বলে শুন কৃষকগণ/ হাল লয়ে মাঠে বেরুবে যখন/ শুভ দেখে করবে যাত্রা/ না শুনে কানে অশুভ বার্তা।/ ক্ষেতে গিয়ে কর দিক নিরূপণ/ পূর্ব দিক হতে হাল চালন/ নাহিক সংশয় হবে ফলন।’
(খ)
‘খনা বলে শুনে যাও,/ নারিকেল মূলে চিটা দাও।/ গাছ হয় তাজা মোটা,/ তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।’
(গ)
‘পূর্ণিমা অমাবস্যায় যে ধরে হাল,/ তার দুঃখ হয় চিরকাল।/ তার বলদের হয় বাত,/ তার ঘরে না থাকে ভাত।/ খনা বলে আমার বাণী,/ যে চষে তার হবে জানি।’
(ঘ)
‘খনা বলে চাষার পো,/ শরতের শেষে সরিষা রো।’
(ঙ)
‘বৎসরের প্রথম ঈষাণে বয়,/ সে বৎসর বর্ষা হবে খনা কয়।’
(চ)
‘উঠান ভরা লাউ শসা,/ খনা বলে লক্ষ্মীর দশা।’
(ছ)
‘খনা ডাকিয়া কন,/ রোদে ধান ছায়ায় পান।’
(জ)
‘ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী, শোন পতির পিতা,/ ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা।/ রাজ্য নাশে, গো নাশে, হয় অগাধ বান,/ হাটে কাটা গৃহী ফেরে কিনতে না পান ধান।’
(ঝ)
‘ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা,/ তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।/ খনার বচন, মিথ্যা হয় না কদাচন।’
(ঞ)
‘মাঘ মাসে বর্ষে দেবা,/ রাজায় ছাড়ে প্রজার সেবা।/ খনার বাণী,/ মিথ্যা না হয় জানি।’
(ট)
‘ধানের গাছে শামুক পা,/ বন বিড়ালী করে রা।/ গাছে গাছে আগুন জ্বলে,/ বৃষ্টি হবে খনায় বলে।’
(ঠ)
‘কচু বনে ছড়ালে ছাই,/ খনা বলে তার সংখ্যা নাই।’
(ড)
‘যে গুটিকাপাত হয় সাগরের তীরেতে,/ সর্বদা মঙ্গল হয় কহে জ্যোতিষেতে।/ নানা শস্যে পরিপূর্ণ বসুন্ধরা হয়,/ খনা কহে মিহিরকে, নাহিক সংশয়।’

Sunday, April 20, 2014

বলুন্ত কি?

এক গাছ টান দিলে বেক গাছ নড়ে
কানা কুক্কা ডাক দিলে গুম গুম করে

কে পারবে এই ধাধার উত্তর দিতে ???

এক সাগরে একটি জাহাজ চলছিল।
একসময় একটি ঝড় এসে জাহাজ ডুবিয়ে দিল।
জাহাজ থেকে তিনজন বেচে গেল।
এক কানা, এক বোবা এবং কানার স্ত্রী।
তারা ভাসতে ভাসতে একটি দ্বীপে পৌছুল।
সেই দ্বীপে এসেই তারা খাবার ও মানুষের সন্ধান করতে লাগল।
কোন খাবার ও মানুষ পেলনা তারা।
কোনরকমে দুদিন কাটানোর পর কানার স্ত্রী মারা গেল।
বোবা তা দেখতে পেল।
সম্মানিত পাঠক আপনারা বলুন তো বোবা কিভাবে কানাকে বুঝাবে যে কানার স্ত্রী মারা গেছে?????????????????????

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সকল মায়ের জন্য রইল শুভেচ্ছা এবং কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা)

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।
সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।
ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,
কোনোখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপন-মনে তাই
ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’
আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’
এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’
ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,
‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’
তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’
আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে,
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’
কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’

মেঘের পরে মেঘ জমেছে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেঘের পরে মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে-
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারই আশ্বাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
তুমি যদি না দেখা দাও
কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার
এমন বাদল-বেলা।
দূরের পানে মেলে আঁখি
কেবল আমি চেয়ে থাকি,
পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায়
দুরন্ত বাতাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।